চিরঞ্জীব মুজিব

মুজিবের কলকাতা, কলকাতার মুজিব

এই কলকাতা, সেই আপনি। কতকাল পরে। তবু এই কলকাতা আপনার কত চেনা। আপনি বঙ্গবন্ধু, কলকাতা আপনাকে পরমাত্মীয়ের অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। রাত্রির তপস্যা শেষে আপনি সূর্যকে ছিনিয়ে এনেছেন, এই উপমহাদেশের প্রাণকেন্দ্র কলকাতা আপনাকে বীরের সম্মান জানাতে উদ্‌গ্রীব। স্বাধীনতাকামী মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ভাষা ও রূপ দিয়েছেন আপনি। সংগ্রামের পীঠস্থান কলকাতা আপনাকে সংগ্রামী অভিনন্দন জানিয়ে গর্বিত।

এই শহর কলকাতার সঙ্গে আপনার অন্তরঙ্গতা সেদিন গভীর ছিল। এর রাস্তাঘাট, মহল্লা, ময়দান, এর মানুষ, মিছিল—সবকিছুই সেদিন আপনাকে আকর্ষণ করেছিল। তখন আপনার বয়স নবীন, কলকাতার মেজাজকে আপনি সেদিন সহজেই আপনার করে নিতে পেরেছিলেন।

সেদিনের কথা আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে। ১৯৪২ সালের জুলাই মাসের সেশনে আপনি কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। তখন সে কলেজের নাম ছিল ইসলামিয়া কলেজ। এখন এর নাম হয়েছে মৌলানা আজাদ কলেজ। সেদিন যাঁরা আপনার শিক্ষক ছিলেন, তাঁদের অনেকের মুখই আজ আপনি কলেজের চৌহদ্দির মধ্যে দেখতে পাবেন না। তাঁদের কেউ কেউ কলেজ থেকে বিদায় নিয়েছেন, কেউ কেউ দুনিয়া থেকেই। আচ্ছা, অধ্যাপক তায়েবকে আপনার মনে আছে? তাঁর কাছে আপনি ইংরেজির ক্লাস করেছেন। অধ্যাপক তায়েবজি এখন কলকাতা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। তাঁর কিন্তু আপনাকে বেশ মনে আছে।

মনে পড়ে আপনার?
সেদিন কলেজে আপনারই সতীর্থ ছিলেন। তাঁরও নাম মুজিবুর রহমান। মৌলানা আজাদ কলেজে তিনি এখন ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের প্রবীণ অধ্যাপক। এক বছর নয়, দুবছর নয়, ২৫/৩০ বছর কেটে গেছে। কিন্তু আপনার অনেক কথাই তাঁর স্মৃতিপটে আজও উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত। সেদিনকার ওয়েলেসলি স্ট্রিটের আজ অবশ্য নামবদল হয়েছে। আজ তা রফি আমেদ কিদোয়াই রোড। ওয়েলিংটন স্কয়ারের মোড়, সে তো বলতে গেলে আপনার কলেজের দোরগোড়াতেই। তারও অন্য নাম হয়েছে, এখন তার নাম রাজা সুবোধ মল্লিক স্কয়ার। আড়াই দশক আগে, কলকাতার রসিদ-আলী-দিনের কথা মনে আছে? সকাল থেকেই আপনি ব্যস্ত। ঘুম ভাঙার পর থেকেই আপনি হোস্টেলে হাজির। সেখানে ছাত্রদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, প্রোগ্রাম করে দিচ্ছেন।

সেখান থেকে কলেজে। রাস্তাটা পার হয়েই কলেজের লাল কাঁকরের পথ। চওড়া কয়েকটা ধাপ। তার ওপরে দাঁড়িয়ে আপনি কত বক্তৃতা দিয়েছেন। পরনে পাজামা, পাঞ্জাবি বা কোর্তা। রোগা, ছিপছিপে, চোখমুখে দুর্জয় সাহসের ছাপ। সেদিন রসিদ-আলী-দিনে আপনার নাবার-খাবার ঠিক ছিল না। ছাত্ররা সেদিন এই শহরকে অনন্যরূপে প্রকাশ করেছিল। একদা আপনার সতীর্থ, অধ্যাপক রহমান আপনাদের দেখেছেন। ছাত্রদের মিছিলের পর মিছিল, তারপর আরও মিছিল, অগুনতি, অসংখ্য, যেন শেষ নেই। আপনি সেদিনের ওয়েলিংটন স্কয়ারের চৌমাথার কাছে দাঁড়িয়ে। বেলা তখন একটার কাছাকাছি। আপনার সঙ্গে আপনার নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দী। আপনার অনেককালের বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা জহীরুদ্দিন এবং কামাল। আপনারা তখন ছাত্রদের মিছিল দেখছিলেন।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button